Samhati
তারুণ্য, সমাজ ও রাজনীতি

তারুণ্য, সমাজ ও রাজনীতি

ফিরোজ আহমেদ

তরুণরা আর রাজনীতি সচেতন নন, দেশ-দুনিয়া নিয়ে তারা আর তেমন ভাবেন না, এমন অভিযোগের খামতি নেই।

ঐতিহাসিক নানান কারণেই বাংলাদেশে অধিকাংশ রাজনৈতিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে থেকেছেন তরুণরা, বিশেষ করে শিক্ষার্থী তরুণরা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ’৬৯ এবং ’৭১ পার হয়ে ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানেও তাদের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পরবর্তী সময়টিতে রাজনীতি নিয়ে তরুণদের আগ্রহ দেখা যায়নি, এমনটা বহু পর্যবেক্ষণেই এসেছে বারংবার।

কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল ১৯৯০ সালে কিংবা ওই দশকে? একক কোনো ঘটনা, নাকি অজস্র ঘটনার লদ্ধিবল সবার অগোচরে কাজ করে গেছে?

নব্বইয়ের দশকের শুরুটাই ছিল বিশ্বব্যাপী মানুষের মনস্তত্ত্বে আদর্শিক পতনের যুগ। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন প্রগতিশীল আন্দোলনকে যেভাবে অস্তিত্ব ধরে আমূল ঝাঁকুনি দিয়েছে, তার ধাক্কা সামলানো দুনিয়াজুড়েই সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের কর্মী হিসেবেও দেখতাম, প্রগতিশীল...

বাংলাদেশে গণতন্ত্র উত্তরণের পথ

বাংলাদেশে গণতন্ত্র উত্তরণের পথ

আবুল হাসান রুবেল

বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সদ্যই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এবং নতুন সরকার গঠিত হলো। এই নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল অনেক কম, অর্ধেকের বেশিসংখ্যক আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। তার চেয়ে বড় কথা, বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে কার্যকর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার তেমন সুযোগও ছিল না। ফলে এই নির্বাচনে জনগণের পছন্দমতো প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সাধারণভাবে যে স্থিতি ও নিশ্চয়তার বোধ তৈরি হয়, তাও এবার অনুপস্থিত। নবগঠিত সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকাও এক ধরনের গোঁজামিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে সরকারে আছে আবার বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করতে চাইছে। বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় `নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের` মাধ্যমে গঠিত হয়ে অর্ন্তবর্তীকালীন দায়িত্ব পালন করবে, না পূর্ণ মেয়াদেই অধিষ্ঠিত থাকবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তাতে অনেক বিদেশি পত্রপত্রিকাই `একদলীয় শাসন`, `কর্তৃত্ববাদী শাসনের` পূর্বাভাস দিচ্ছে। আমরা আশা করতে চাইব, এ সংকটও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব। কর্তৃত্ববাদী শাসনের ধারাবাহিকতা নয়, বরং একটা গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের স্বপ্নই আমরা বাংলাদেশের জন্য দেখি। সে ক্ষেত্রে পদক্ষেপ নিতে হবে দেশের সামগ্রিক মঙ্গলের প্রশ্ন বিবেচনায় রেখে। নির্মোহভাবে গণতন্ত্রের প্রকৃত বাধাবিপত্তি চিহ্নিত করে তা মোকাবিলার মাধ্যমে। সেই প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখেই এখানে কয়েকটি...

মালোপাড়ায় বাংলাদেশ

মালোপাড়ায় বাংলাদেশ

ফিরোজ আহমেদ

`একটা জিনিস লক্ষ করবেন, ব্রিটিশরা যেটাকে সাম্প্রদায়িকতা বলছে, হিন্দু-মুসলমান বিভেদ বলছে, যার ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলো, সেই জিনিসটা কিন্তু ব্রিটিশ আসার আগে এ দেশে ছিল না।` ব্রাত্য রাইসুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সলিমউল্লা খানের বরাতে পাওয়া অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের এই মতটি গ্রহণ করা কঠিন। সাম্প্রদায়িকতা কিংবা হিন্দু-মুসলমান বিভেদের সামাজিক কারণগুলো ব্রিটিশদের আগমনের আগেই যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। মঙ্গল কাব্যের বহু লেখকই দুই সম্প্রদায়ের সংঘর্ষ সম্পর্কে একটি পরিচ্ছেদ রাখতেন, অন্য সূত্রগুলোতেও এমন নিদর্শন ঢের আছে।
সুলতানি আমলে লিখিত বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলের বর্ণনায় মুসলমান কাজী হিন্দুর আচারাদি পালনে কোনো আপত্তি করেননি। মোল্লা কিন্তু সর্পদেবীর পূজানুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় কাজীকে র্ভৎসনা করেন। কাজী আর মোল্লার মধ্যে ফারাকটি জরুরি, একজন রাজক্ষমতাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, অন্যজন সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করছেন। রাজার লক্ষ্য কর আদায়, ক্ষমতার বিকাশ ও স্থায়িত্ব সাধন, তাই প্রয়োজন যথাসম্ভব সাম্প্রদায়িক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। এসবের স্বার্থেই তিনি সাধ্যানুযায়ী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসকে নিরুৎসাহিত করবেন, কিন্তু নিজ ধর্মের লোকদের কাছে `ধার্মিক` সাজারও যথাসম্ভব চেষ্টা করে যাবেন। রাজার বিপদ একদিকে সংখ্যাগুরু ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রজাকে ক্ষিপ্ত করতে সাহস না করা, অন্যদিকে তাঁর শেষ ভরসা ও...

নির্বাচন ও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

নির্বাচন ও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ

আবুল হাসান রুবেল

বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্তমান নির্বাচনের সঙ্গে তুলনীয় উদাহরণ আছে দুইটি- এরশাদের অধীনে ১৯৮৮ সালের নির্বাচন এবং বিএনপির ১৫ ফেব্রুয়ারি `৯৬-এর নির্বাচন। প্রার্থীসংখ্যা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীহীন সংসদ সদস্যের বিবেচনায় এই নির্বাচন পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৮৮-র নির্বাচনে প্রার্থীসংখ্যা ছিল ১১৯২, দলসংখ্যা ছিল ৮, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৮ জন। ১৯৯৬ সালে প্রার্থীসংখ্যা ছিল ১৪৫০, দলসংখ্যা ৪১ এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ৪৯ জন। এবারের নির্বাচনে ১৪৭ আসনে প্রার্থীসংখ্যা ৩৯০ জন, দলসংখ্যা ১২ এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন ১৫৩ জন। পূর্ববর্তী দুই নির্বাচনের পরবর্তী ফলাফল হয়েছিল দুই রকমের, তবে কোনো সরকারই বেশি দিন টেকেনি। `৮৮-র ভোটারবিহীন নির্বাচন তার বিরুদ্ধে চলমান গণ-আন্দোলনকে তীব্র করে তুলেছিল এবং পরিণতিতে এরশাদের পতন ঘটেছিল ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে। পক্ষান্তরে ১৫ ফেব্রুয়ারি `৯৬-র নির্বাচন ছিল ভোটারবিহীন নির্বাচনের আরেক উদাহরণ। তবে এর আগেই সরকার ও বিরোধী দলের ভেতর তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল এবং সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্যই সেই নির্বাচনটি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি `৮৮ বা `৯৬- কোনোটির মতোই নয়। এরশাদ ছিল সামরিক স্বৈরশাসক, বর্তমানে ক্ষমতাসীন তিন-চতুর্থাংশ আসন নিয়ে নির্বাচিত একটি দল। `৯৬-র নির্বাচনের আগেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে একটা সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী দলগুলোর ভেতর কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। বাংলাদেশের সমাজও এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি বিভক্ত। নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে একটা অনিশ্চয়তা, একটা মুখোমুখি সহিংস পরিস্থিতি বিরাজ করছে, নানা ধরনের আন্তর্জাতিক সমীকরণ এখানে ক্রিয়াশীল...

মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম কারও একার নয়

মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম কারও একার নয়

যেভাবে নির্বাচন হলো, তা নিয়ে আর কি কথা বলার কিছু আছে? ১৯৮৮, ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের সব উপাদানই এ বছর আরও বেশি করে ছিল। আগের ওই দুই বছরের মতো এবারও কাগজপত্রে সংখ্যার জালিয়াতি পাওয়া যাবে অনেক। এর মধ্য দিয়ে ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে আওয়ামী লীগের কৃতিত্ব ঢাকা পড়ে গেল। ইতিহাসে এরশাদ ও খালেদার সঙ্গে জাল নির্বাচনের একই ধারায় হাসিনার নামও যুক্ত হলো। এ রকম একটি নির্বাচনের পক্ষে মন্ত্রী-সাংসদ ও কতিপয় বুদ্ধিজীবী যেভাবে মুখর, তাতে দুই কান কাটা-সম্পর্কিত গল্পই মনে পড়ে। এবারের এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আপত্তির বিষয়, সবই হচ্ছে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র নামে।

আওয়ামী লীগ সরকার তার যাবতীয় কাজের ব্যানার হিসেবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে। যে সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আপ্তবাক্য হিসেবে ব্যবহার করে, তার ভূমিকার বিশিষ্টতা কী হবে? বিএনপি-জামায়াত জোট আমলের দুর্নীতি, দখল, সন্ত্রাস, স্বেচ্ছাচারিতা, দলীয়করণ—এসব মহাজোট সরকারের মধ্যে কোনোভাবেই কম ছিল না, বরং অনেক ক্ষেত্রে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত নির্বাচনের হলফনামা থেকে বাংলাদেশের মানুষ জেনেছে, এই সরকারের মন্ত্রী-সাংসদেরা গত কয়েক বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, চার বছরে দুই গুণ থেকে এক হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে সম্পদ। কীভাবে বৃদ্ধি পেল, তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়। তা ছাড়া এই ঘোষিত সম্পদের তথ্য যে খুবই অসম্পূর্ণ, সেটাও সবাই জানে। হল-মার্ক, শেয়ারবাজারসহ হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের খবর ঢাকা দেওয়া যায়নি। কেন সরকারি দল একতরফা নির্বাচন-প্রশ্নে অনমনীয়, কেন ক্ষমতা যেকোনো মূল্যে আঁকড়ে ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তার ব্যাখ্যা এই সম্পদ উপার্জনের প্রক্রিয়া ও তার নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকেই বোঝা সম্ভব। ক্ষমতার কারণে যে বিপুল সম্পদ এসেছে, ক্ষমতায় না থাকলে তার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? এ ছাড়া আরও বড় বড় প্রকল্প, বড় বড় কমিশনের হাতছানি। এগুলো ঢাকতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর একাত্তরকে ব্যবহার।